দইয়ের রাজধানী বগুড়ার সকাল যেন অন্যরকম—মাটির পাত্রের ভেতর ঘন দুধের নিঃশব্দ জমানো, বাতাসে ভেসে বেড়ানো দইয়ের নরম মিষ্টি গন্ধ, আর লোককথায় বোনা এক দীর্ঘ ইতিহাসের উপস্থিতি। যেন প্রতিটি বাটিতে জমে আছে সময়ের দীর্ঘ পথচলা— মানুষের জীবনসংগ্রামের আলো-ছায়া, গৃহস্থবাড়ি থেকে শুরু করে রাজদরবারের আপ্যায়ন, কৃষিজমির স্বপ্ন আর বাঙালির ঘরোয়া রান্নাঘরের শত বছরের গল্প। বগুড়ার দই শুধু খাবার নয়; এটি স্মৃতি,ঐতিহ্য এবং মানুষের রুচির এবং স্বাদের এক অমায়িক মেলবন্ধন। স্বাদের এক বাটিতে অমর হয়ে থাকা এই গল্প আমাদের নিয়ে যায় সেই অতীতে, যেখানে দুধের ফেনা আর মাটির ঘ্রাণ মিলে তৈরি হয় মানবসৃষ্ট স্বাদকোরকের অপরাজিত এক কিংবদন্তি।
শুরুর কথা
দইয়ের দোকানে মিষ্টি, আর মিষ্টির দোকানে দইয়ের নির্বিরোধ সহাবস্থান চলে আসছে বহুকাল থেকে। দইয়ের আদি নিবাস যেমন বঙ্গদেশে নয়, তেমনি বগুড়ার দইয়ের আদি নিবাসও বগুড়া শহরে নয়, পাশের উপজেলা শেরপুরে। বগুড়ার দইয়ের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরপরই শেরপুর উপজেলা থেকে। স্থানীয়দের মতে সনাতন ঘোষ সম্প্রদায় দই তৈরি করে বগুড়াকে দেশের সর্বত্র পরিচিত করে তুলেছিল। জানা যায় বগুড়ার শেরপুরে প্রথম দই তৈরি হয় প্রায় আড়াইশ বছর আগে। তৎকালীন বগুড়ার শেরপুরের ঘোষ পরিবারের ঘেটু ঘোষ প্রথম দই তৈরি আরম্ভ করেন। টক দই তৈরি থেকে বংশ পরম্পরায় তা চিনিপাতা বা মিষ্টি দইয়ে রূপান্তরিত হয়। আর কালের বিবর্তনে স্বাদের বৈপরীত্যের কারণে দইয়ের বহুমুখী ব্যবহার শুরু হয়। টক দই দিয়ে মেজবানের রান্না ও ঘোল তৈরি হয়। অতিথি আপ্যায়নে চলে মিষ্টি দই।
অতীত যা বলে
বগুড়ার শেরপুরের দইয়ের প্রবল অনুরাগী ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাব মোহাম্মদ আলী। তিনি শেরপুরের ঘোষপাড়ার গৌর গোপালকে বগুড়ায় নিয়ে যান। নবাববাড়ি রোডে গৌর গোপাল তাঁর দইয়ের ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৩৮ সালের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ গভর্নর স্যার জন এন্ডারসন বগুড়ায় নবাববাড়িতে অতিথি হয়ে এলে কাচের পাত্রে পাতা দই দিয়ে নবাব তাঁকে আপ্যায়িত করেন। গভর্নর বগুড়ার দইয়ের স্বাদে পরিতৃপ্ত হয়ে ইংল্যান্ডে দই নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এভাবেই কালক্রমে বগুড়ার দই দেশের বাইরেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এছাড়াও গত শতকের ষাদটর দশকের কথা। আইয়ুব খান তখন পাকিস্তানের শাসক। বাঙালিকে না ভালোবাসলেও বাঙালির দইকে ভালোবাসতেন। বগুড়ায় গিয়ে তিনি দই খেয়েছেন। পরে সেই দই আরও অনেককে খাইয়েছেন। লোকে বলে আরো জানা যায়, গেল ষাটের দশকে বগুড়ার দই ইংল্যান্ডের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথও খেয়েছেন।
বগুড়ার দই সেরা কেন
সারা বাংলাদেশে দই পাওয়া গেলেও স্বাদে ও গুণে অতুলনীয় বগুড়ার দই। এর কারণ হলো বগুড়ার দই তৈরীর বিশেষ পদ্ধতি। অনেকে মনে করেন দই এর স্বাদ নির্ভর করে স্থান, পরিবেশ, গবাদিপশুর খাদ্য, মাটির পাত্র ইত্যাদির ওপর। বগুড়ার কারিগররা এক বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করে দই তৈরী করে আসছে বহুবছর ধরে। মান নিয়ন্ত্রণেও তারা যত্নবান। দুধ, চিনি আর মাটির কাপ বা সরা ব্যবহৃত হয় দই তৈরিতি। একটি বড় পাত্রে ছয় ঘণ্টা দুধ ও চিনি জ্বাল দেওয়া হয়। পরে লালচে বর্ণ ধারণ করলে তা মাটির সরা বা কাপে ঢেলে ঢেকে রাখতে হয়। এরপর সারারাত ঢাকা থাকার পর সকালে পাওয়া যায় দই। ১৬ মণ দুধে প্রায় ৪৫০ সরা দই বানানো সম্ভব বলে জানান কারিগররা।
সামাজিক স্বীকৃতি
একেক এলাকার দই-মিষ্টির স্বাদ একেক রকম। দীর্ঘকালের ঐতিহ্যের পরম্পরায় কোনা কোনো এলাকার দই মিষ্টি খ্যাতি জনপ্রিয়তার তুঙ্গ স্পর্শ করে। তখন সেটি ওই এলাকার পরিচয়ের স্মারক বা প্রতীক হয়ে ওঠে। যেমন বগুড়ার দই। এবার তার খ্যাতির মুকুটে যুক্ত হলো ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)২০২৩ সালের ২৫ জুন এ অনুমোদন দেয়।
অর্থনীতিতে দইয়ের অবদান
বগুড়ায় দই শুধু খাদ্য নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতির একটি শক্ত ভিত্তি। শেরপুরের এই দইয়ের বাজারকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় প্রায় ৬ হাজার দুগ্ধ খামার। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানালেন, শালফা, গজারিয়া, মথুরাপুর এসব এলাকাতেই দুগ্ধ খামারের সংখ্যা বেশি। এসব খামার থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার লিটার দুধ আসে। পৌর শিশুপার্কের সামনে দুপুর থেকে বসে দুধের বিশাল বাজার। এ ছাড়া ভবানীপুর, রানিরহাট, মির্জাপুর সীমাবাড়ি এলাকাতেও দুধের বড় বাজার বসে। বংশীয় ঘোষ ও দই কারখানার মালিকেরা এসব বাজার থেকে দই-মিষ্টি তৈরির দুধ কিনে থাকেন। এছাড়াও বগুড়া জেলার বিভিন্ন গ্রামে দই তৈরির সঙ্গে শত শত পরিবার জড়িত। মাটির পাত্র তৈরির কাজ, দুধ সরবরাহ, প্যাকেজিং, পরিবহন — পুরো শৃঙ্খলটি একটি বড় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ঈদ, পূজা বা কোনো বড় উৎসবে দইয়ের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ সময় অনেক দোকান রাতভর কাজ করে। বগুড়ার অনেক পরিবার জানিয়েছেন, একটি ভালো মানের দইয়ের ব্যবসা তাদের বার্ষিক আয়ের বড় অংশ নিশ্চিত করে।
নকল দই, দাম বৃদ্ধি—চ্যালেঞ্জ
জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে চ্যালেঞ্জও এসেছে। বাজারে নকল দইয়ের বিস্তার, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া, কিছু ব্যবসায়ীর গুণগত মান কমিয়ে দ্রুত লাভ করার চেষ্টা—এসবই দই শিল্পকে চাপের মধ্যে ফেলে। তবে পুরনো প্রতিষ্ঠানেরা এখনো ঐতিহ্য রক্ষা করে মান ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
মিষ্টির সঙ্গে দই-এর মিলন না হলে জুড়িটা যেন ঠিকমতো মেলে না। সে কারণেই বলা হয় ‘দই-মিষ্টি’। বগুড়ার দইয়ের গল্প যেন সময়ের পাতায় লেখা একটি নরম কবিতা—যার শব্দ হলো দুধের ঘ্রাণ, যার ছন্দ মাটির পাত্রের শীতল নিঃশ্বাস। শত বছরের পরম্পরা, কারিগরি দক্ষতা, আর অগণিত শ্রম মিলেমিশে আজও তৈরি করে এক অনন্য স্বাদের বিস্ময়। পৃথিবী যত আধুনিকই হোক, প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক—বগুড়ার দই ঠিক ততটাই নিবিড়ভাবে আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
