“স্বপ্ন সেটা নয় যা তুমি ঘুমিয়ে দেখো বরং স্বপ্ন সেটাই যা তোমাকে ঘুমোতে দেয় না।” এপিজে আবুল কালাম আজাদের এই উক্তিই সারা বিশ্বের কতশত তরুণের স্বপ্নকে ডালা মেলাতে সাহস জুগিয়েছে সে কথা বলার অন্ত নেই। প্রতিটি সফল মানুষের পেছনেই এমন কত অনুপ্রেরণা কাজ করেছিলো সেটা হয়তো অনেকেরই অজানা। এমনই এক তরুণ রয়েছে যে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে অদম্য সাহস নিয়ে এগিয়ে চলছে স্বপ্ন পূরণের পথে। বগুড়ার গাবতলী পৌর এলাকার মাস্টারপাড়ার শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান লিমনকে নিয়ে সে কথা লিখেছেন আশরাফুল ইসলাম আকাশ…
জন্ম থেকেই দুটি হাত থাকলেও তা অকেজো। শুধু ডান পা দিয়ে লিখে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন রাকিবুল হাসান লিমন। এর আগে পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসিতেও ভালো ফলাফল করেছেন। অদম্য এই যুবকের স্বপ্ন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া।
গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়ের বাগবাড়ি গ্রামের শহিদুল ইসলাম ও মোছাঃ লতা খাতুনের ছেলে রাকিবুল হাসান লিমন। বগুড়ার সদরের ধাওয়া পাড়ার তাহেরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। লিমন ২০২০ সালে গাবতলীর পূর্ব পাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। সে পরীক্ষায় পাঁচে ৪ দশমিক ১১ পান।
বাবা শহিদুল ইসলাম বগুড়া শহরের আল-আমিন কমপ্লেক্সের নিচে ছোট একটি পানের দোকানী। মা লতা খাতুন গৃহিণী। দুই ভাই মধ্যে লিমন পরিবারের বড় সন্তান। ছোট ভাই রাকিব স্থানীয় একটি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র।
২২ বছর বয়সী রাকিবুল হাসান পলিওমাইলাইটিস উইথ মেনিনজাইটিস রোগে আক্রান্ত। এজন্য তার দুটি হাতই অকেজো। একই সাথে ঘাড় এবং ঠোঁটও বাঁকা। এতে তার কথাগুলো বেশ অস্পষ্ট।
কথার জড়তা নিয়েই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্বপ্নের কথা জানালেন রাকিবুল হাসান। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই অনেক বাঁধা অতিক্রম করছি। বাবা-মা ও শিক্ষকদের সহায়তায় পড়ালেখা করে যাচ্ছি। এবার এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করে বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে ভর্তি হতে চাই। তবে সুযোগ-সুবিধা পেলে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই।’
ছেলে লিমনকে স্বপ্নের পথে এগিয়ে নিচ্ছেন শহিদুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘জন্মের কয়েকমাস পরে জানতে পারি আমার ছেলে অসুস্থ। সে অন্য দশজনের চেয়ে আলাদা। তখন আমার মন ভেঙ্গে গিয়েছিল। তবে আমার ছেলের মানসিক শক্তি ও তার লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগ আমাকে অনুপ্রাণিত করে। এজন্য তাকে স্বপ্নের পথে চলতে সব ধরনের সহায়তা করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ছেলের গোসল, মল-মূত্র ও যাবতীয় বিষয়গুলো আমিই দেখি। ওর মা (লতা খাতুন) সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকায় এসব আমাকেই করতে হয়। কিন্তু স্বল্প আয়ে তার সব ইচ্ছা পূরণও করতে পারি না।
তবে শুধু লেখাপড়াতেই নয়, শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ডান পায়ের সাহায্যে কম্পিউটার চালান লিমন। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই ইন্টারনেটে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্রাউজ করছিলেন।
শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ছেলের স্বপ্ন পূরণের জন্য এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। পানের দোকানের স্বল্প আয়ে সংসার খরচের পাশাপাশি দুই সন্তানের পড়ালেখার ব্যয় আমার জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে যায়। এসময়ে আর্থিক সহায়তা কিংবা ভরনপোষণের স্থায়ী কোনো সমাধান পেলে শান্তি পেতাম।’
