শীতকাল আসতেই খেজুরের রস খাওয়ার ধুম পরে যায়। আর এক্ষেত্রে সুস্বাদু ও ভেজাল মুক্ত রসের জুড়ি নেই। গ্রামে গঞ্জে খেজুর গাছ থাকলেই দেখা মেলে প্রতিটি গাছের সাথে রসের হাড়ি ঝুলানো।
খেজুরের রস দিয়ে তৈরি গুড়, পাটালি, মিছরি, নলেন গুড় দিয়ে নানা ধরণের পিঠার আয়োজন করা হয় শীতের সময়।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতে, বাংলাদেশে সাধারণত কার্তিক থেকে মাঘ মাস অর্থাৎ অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয়। এদেশে সবচেয়ে বেশি রস সংগ্রহ হয় যশোর, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরে।
তবে খেজুরের রসের সাথে নিপা ভাইরাস নামটিও দেশবাসী শুনে আসছে প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে। আর রস খাওয়ার সাথে এ নিয়ে আতঙ্ক থাকে প্রায় সকল রস প্রেমিদের মাঝেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, নিপাহ ভাইরাস এক ধরনের ‘জুনোটিক ভাইরাস’, যা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। পরে সেটি অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্বে প্রথম নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ায় শূকর খামারিদের মধ্যে। পরে এই ভাইরাস বাংলাদেশে শনাক্ত হয় ২০০১ সালে।
এরপর জানা যায়, বাদুড়ই নিপাহ ভাইরাস খেজুরের রসে ছড়িয়ে দিয়েছে। খেজুরের রসের হাঁড়িতে বাদুড়ের মল লেগে থাকতে দেখা যায়।

আইইডিসিআরের তথ্যমতে, ২০০১-২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে ৩০৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৭০ শতাংশ।
এখন পর্যন্ত নিপাহর সংক্রমণ নওগাঁ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, ঠাকুরগাঁও, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ, রংপুরসহ দেশের ৩১টি জেলায় দেখা গেছে। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মস্তিষ্কে ভয়াবহ প্রদাহ দেখা দেয়। এতে রোগী জ্বর ও মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন। এক পর্যায়ে খিঁচুনিও দেখা দিতে পারে।
খেজুরের রসে নিপা ভাইরাস ছড়ানোর কারণঃ
রস সংগ্রহের জন্য গাছিরা গাছে সারারাত পাত্র ঝুলিয়ে রাখেন। যেখানে বাদুর রাতে রস পান করার জন্য আসে এবং সেখানে মুখ লাগিয়ে রস পান করে। এতে করে তাদের মুখ থেকে নিঃসৃত লালা এবং তাদের মল মূত্র খেজুরের রসের সাথে মিশে যায়।
এই দূষিত রস কাঁচা অবস্থায় গাছ থেকে নামিয়ে খেলে সেখান থেকে নিপা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে করে সংক্রমনের দেহে জ্বর, মাথা ব্যাথা, কাশি, বমি ভাব, ডায়রিয়া সহ নানা ধরণের শারীরিক জটিলতায় ভুগতে শুরু করে। যার ফলাফল স্বরূপ শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মুখে ধাবিত করে।
খেজুরের রস খাওয়ার উপায়ঃ
নিপা ভাইরাস সংগ্রহে কোন টিকা কার্যকর নয় এখন পর্যন্ত। তাই এই রস খাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা একান্ত জরুরি। প্রথমত রস সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। চেষ্টা করতে হবে দ্রুত রস বিতরণ করার ও ঢেকে রাখার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ভাইরাস থেকে নিস্তার পাওয়ার প্রধান উপায় হলো গাছগুলোর রস সংগ্রহের জায়গায় প্রতিরক্ষামূলক আবরণ বা স্যাপ স্কার্ট ব্যবহার করা। যেন বাদুড় এর সংস্পর্শে আসতে না পারে।
স্যাপ স্কার্ট হলো- বাঁশ, কাঠ, ধইঞ্চা, পাটের খড়ি বা পলিথিন দিয়ে বানানো বেড়া। যেটা রসের নিঃসরণের চোঙের মাথা থেকে কলসির মুখ পর্যন্ত পুরোটা গাছের সঙ্গে বেঁধে ঢেকে রাখা।
তবে আইসিডিডিআর’বির গবেষকরা গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে দেখতে পেয়েছেন, রসের হাড়ির চারপাশ জাল বা স্যাপ স্কার্ট দিয়ে ঢাকা থাকলেও বাদুর কলসির মুখ বরাবর প্রস্রাব করে। ফলে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
তাই কাঁচা খেজুরের রস পান করা থেকে বিরত থাকুন। জীবন বাঁচাতে রস সেদ্ধ করে পান করুন। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, রস সংগ্রহের পর আগুনে ৭০-৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে উত্তপ্ত করতে হবে। তাহলেই ভাইরাস মরে যাবে।
খেজুরের রস এতোটা নিয়ম ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সংগ্রহ করা হয়েছে কি না সেটা নিশ্চিত হওয়া জরুরি এজন্য বিশ্বস্ত সূত্রে রস সংগ্রহ করুন।
সূত্রঃ বিবিসি
