ডিসেম্বর ১, ২০২৫ ৩:৪৮ পূর্বাহ্ণ

জমিতে জমেছে পানি; পচে যাওয়ার আশঙ্কায় আলু, লুটিয়ে পড়েছে ধান-সবজির গাছও 

কৃষি প্রধান দেশের শস্য ভান্ডার হিসেবে হিসেবে পরিচিত উত্তরের জেলা নওগাঁ। এ জেলা বরাবরই কৃষির দিক দিয়ে এগিয়ে। একসময় শুধু বিখ্যাত ছিল ধান-চাল উৎপাদন। এখন যোগ হয়েছে আম উৎপাদন। এছাড়া অন্যান্য সবজি ফসল উৎপাদনেও রয়েছে সুখ্যাতি।

কৃষকরা বলছেন এই জেলায় যে ফসলই উৎপাদন করা হোক, সেটার ফলন হয় ভালো। তবে প্রাকৃতিক ভাবে বা পোকামাকড়ের দ্বারা সৃষ্টি ক্ষতি এর ব্যতিক্রম।

এরই মধ্যে একটি ফসল আলো। গতবছর এই আলু চাষ করে লোকসানে পড়ে নওগাঁর কৃষকরা। সেই লোকসান পুষিয়ে নিতে আগাম আলু চাষ শুরু করেন তারা। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কয়েদিনের বৃষ্টিতে ফসলি জমিতে পানি জমে।

ফলে যেসব জমিতে আগাম আলু রোপণ করা হয়েছে, সেসব জমিতে পানি জমায় রোপণ করা আলুর বীজ পচে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। যার কারণে আলু চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এছাড়াও রোপা আমন ধান ও আগাম শীতকালীন শাক-সবজিতে ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, জেলায় আমন ধান চাষ হয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার হেক্টর জমিতে। আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে ১ হাজার ৮৪৫ হেক্টর জমিতে। আলু চাষের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ হাজার হেক্টর জমিতে।

বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, আলু আবাদের জন্য কোথাও কোথাও প্রস্তুত করা হয়েছিল জমি, আবার কোথাও সদ্য রোপণ করা হয়েছে বীজ। বৃষ্টিতে জমিতেই জমেছে পানি। ফসল বাঁচাতে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা। শুধু আলু খেত নয়, আগাম জাতের শীতকালীন ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, মরিচ, বেগুন, মুলাসহ বিভিন্ন শাক-সবজির গাছও মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। যেসব খেতের সবজি এখনো ভালো রয়েছে, তা রক্ষায় প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন কৃষকেরা। এছাড়াও মাঠের আধা-পাকা ধান হেলে পড়েছে, গড়াগড়ি খাচ্ছে পানিতে।

কৃষকরা জানান, গেল বছর আলুর ভালো দাম না পাওযায় এবছর ভালা লাভের আশায় আগাম আলু চাষ শুরু করেন তারা। তবে কয়েকদিনের বৃষ্টি হওযায় আলুর জমিতে পানি জমে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানিতে রোপণকৃত বীজ পচে গেলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা। অন্যদিকে অনাবাদী জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের পর বীজ রোপণ কবে করা যাবে তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। শীতকালীন শাক-সবজির জমিতেও দেখা দিয়েছে শিকড় পচে যাওয়ার। পানি দ্রুত না সরলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকেরা।

আত্রাই উপজেলা কালিকাপুর ডাঙ্গাপাড়া এলাকার কৃষক জয়নাল জানান, ‘গতবছর আলু চাষ করে অনেক লোকসান হয়েছে। ভাবলাম একটু আগাম আলু লাগালে ভালো দাম পাওয়া যাবে। সেই আশায় দেড় বিঘা জমিতে আলু বীজ রোপণ করে এক সপ্তাহ হয়নি। এরমধ্যে বৃষ্টি। এখন বৃষ্টির পানি জমে থাকায় গাছ ঠিক মতো উঠতে নাও পারে। কি করব ভেবে পাচ্ছি না।’

মান্দা উপজেলার ভারশো এলাকার কৃষক আশরাফ হোসেন বলেন, ‘আগাম আলু চাষে কিছুটা ঝুঁকি থাকে। এলাকার কয়েকজনের আলু লাগানো দেখে আমিও এক বিঘা জমিতে আলু লাগালাম। কয়েকদিনের থেমে থেমে বৃষ্টি হওযায় আলুর জমিতে পানি জমে গেছে। এতে করে রোপণকৃত বীজ পচে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।’

সদর উপজেলা বর্ষাইল এলাকার কৃষক রতন মোল্লা বলেন, ‘সবেমাত্র কিছুদিন আগে আলুর বীজ রোপণ করেছি। এরই মধ্যে বৃষ্টি। এখনও মাঝে মাঝে মেঘে ঢেকে আসছে। ঝির ঝির করে বৃষ্টিও পড়ছে। মাটির নিচে রোপণ করা আলুর বীজ একটু পানি পেলে পচে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ক্ষেত্রের অধিকাংশ আলু পচে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’

হাপানিয়া এলাকার সুশীল মিস্ত্রি বলেন, ‘ধান পাকতে শুরু করেছে। কিন্তু কয়েকদিনের বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় আমন ধানের গাছ মাটিতে নুয়ে গেছে। এখনো ফসলের খেতে অনেক পানি জমে রয়েছে। দ্রুত পানি সরাতে না পারলে অনেক ক্ষতি হবে।’

কীর্ত্তিপুর এলাকার সবজি চাষি ইন্দ্রি মিয়া বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে গুঁড়ি গুঁড় বৃষ্টি হচ্ছে। এতে ফুল কপিসহ বিভিন্ন সবজির গাছের গোড়ায় পচন দেখা দিয়েছে। অসময়ের বৃষ্টিতে কৃষকরা খরচের টাকাও তুলতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় আছে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হোমায়রা মন্ডল জানান, ‘বৃষ্টি হলেও ভারী বর্ষণ হয়নি। সবেমাত্র আলু রোপণ শুরু হয়েছে। যেসব জমিতে আলু লাগিয়ে ৮-১০ দিন হয়েছে সেগুলোর ক্ষতি হবে না। এছাড়া শীতকালীন সবজি ও ধানের খুব বেশি ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। ধানের জন্য বৃষ্টি কিছুটা আর্শীবাদ। খেত থেকে পানি সরে গেলে কোন সমস্যা হবে না।’

 

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Email
Print