এখন শুধু শহরই নয় গ্রামগঞ্জেও ইট-পাথরের দালানের ভিড়। অথচ একসময় গ্রামের বিত্তবানরা মাটির দেয়াল দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করতেন। যুগের পর যুগ ধরে এসব মাটির বাড়িগুলো ঐতিহ্যের বাহক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আজ নওগাঁ শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে মহাদেবপুরের ছোট একটি গ্রামে রওনা হয়েছি। সঙ্গী হিসেবে রাস্তার দুধারের গাছগুলো সবুজ ছাউনি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতির অপরুপ এই সৌন্দর্য দেখতে দেখতে গন্তব্যে যাচ্ছি। প্রথমে সিনএনজি ও পরে ব্যাটারিচালিত রিকশায় ৪০ মিনিটের যাত্রা শেষে আজকের গন্তব্যে পৌঁছালাম। এবার নিদর্শনটি দেখতে যাবার পালা।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর চেরাগপুর ইউনিয়নের আলিপুর গ্রামের মাটির তৈরি বাড়িটির ১০৮টি কক্ষ রয়েছে। এই বাড়িতে এখন ৪০ জনের বসবাস। আর এ কারণেই মাটির দোতলা বাড়িটির গুরুত্ব বেড়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাড়িটি দেখতে প্রতিদিনই আসছেন দর্শনার্থীরা।
এই গ্রামের তাহের আলী মণ্ডল ও তার ছোট ভাই শমসের আলী মণ্ডল ১৯৮৬ সালে শখ করে এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। সেসময় একটি পুকুর খনন করে সেই মাটি দিয়েই প্রায় ছয় বিঘা জমির ওপর নির্মাণ করা হয় দোতলা এই বিশাল বাড়ি। ১৫০ জন শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমে পুরো বাড়ি নির্মাণে সময় লাগে প্রায় ৯ মাস। এটি নির্মাণে ব্যবহার করা হয় মাটি, খর, তালগাছের তীর, বাঁশ, টিন ও কাঠ।

দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ এই দোতলা বাড়িটির দৈর্ঘ্য ৩০০ ফুট ও প্রস্থ ১০০ ফুট। সৌন্দর্য বর্ধনে মাটির দেয়ালে চুন ও আলকাতরার প্রলেপ দেয়া হয়েছে।
১০৮ কক্ষের এই বাড়িতে প্রবেশের বড় দরজা আছে সাতটি। তবে প্রতিটি ঘরে রয়েছে একাধিক দরজা। দোতলায় ওঠার সিঁড়ি রয়েছে ১৮টি। ৯৬টি বড় ও ১২টি ছোট কক্ষ রয়েছে বাড়িতে।
মন্ডল বাড়ির নির্মাতা দুই ভাই অনেক আগেই পরলোকগমন করেছেন। আর তাইতো বর্তমান প্রজন্মের ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিরা বাস করছেন সেখানে।
এবার বাড়ির ভেতরে যাব। তবে বাড়িটির একাধিক দরজা থাকায় একপাশে প্রবেশ করছি। বাড়িটির ভেতরে বেশ কারুকার্য শোভিত একটি আঙ্গিনা আছে। মেহেদি গাছের পাশে থাকা রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিলেন বাড়ির মহিলারা।এছাড়াও চোখে পড়ল কবুতরের খোপ। ঘরের সামনেই কাঠের তৈরী বড় একটি টুল বিছানো আছে। মেহমানরা আসলেই সেখানে তারা বসতে পারেন।
বাড়ি থেকে বের হয়ে ঘর থেকে বর্ধিত টিনের চালের নিচে খরখুটো নানা প্রয়োজনীয় তৈজসপ্ত্র রাখা হয়েছে। তবে মজার বিষয় হলো আধুনিক সময়েও চোখে পড়লো গরুর গাড়ির ছই। বাসার সামনে বিশ্রামের জন্য রয়েছে ছোট একটি মাচাং।
বাড়িটির সামনেই আট বিঘা আয়তনের বিশাল পুকুর। বর্তমানে পুকুরে নানা জাতের মাছ চাষ করছেন তারা।
শহরকে ছাপিয়ে দিনের পর দিন যেভাবে প্রান্তিক অঞ্চলে ইট-সিমেন্টের দালান গড়ে উঠছে তাতে হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মরা মাটির বাড়িই খুজে পাবে না। হয়তো একটা সময় এসব বাড়িগুলো রুপকথার মতো মানুষের মুখে মুখে ফিরবে। তবে এসব মাটির বাড়িগুলোর যত্ন নিলে আরো কয়েকশ বছর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
