সকাল থেকেই কয়েক দফা বৃষ্টি পড়েছে। তবুও বৃষ্টি আর অদেখাকে দেখার কৌতূহল নিয়ে শেরপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলাম। অবশেষে ধুনট মোড় থেকে অটোরিকশায় করে চলতে থাকলাম শাহবন্দেগী ইউনিয়নের খন্দকার টোলা গ্রামে।
আগে থেকেই মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম যে এদিকের রাস্তার অবস্থা খানিকটা খারাপ হবে। কিন্তু ধারণার চেয়েও বেশ ভোগান্তি পোহাতে হলো। গ্রামটির অধিকাংশ রাস্তায় বেশ পানি জমে আছে। তবে রিক্সার জন্য কিছুটা রেহায় পেয়েছি।
প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো মোগল আমলে নির্মিত এই নির্দশনটি দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভ্রমন পিপাসুরা ছুটে আসেন। এটি মুসলিম স্থাপত্যের ঐতিহাসিক নিদর্শন খেরুয়া মসজিদ। এটার নির্মাণশৈলীর সঙ্গে বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের বেশ মিল রয়েছে।

প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল একটি পুরনো কবর। এখানে শায়িত আছেন আবদুস সামাদ নামের এক ব্যক্তি। তিনি ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক মানুষ। শুধু তাই নয়, এই মসজিদটির স্বপ্নদ্রষ্টাও ছিলেন তিনিই।
এখানকার তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই কবরের সীমানা প্রাচীরটি তৈরী করা হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। তবে আগের দিনে কবরটি বোঝার জন্য শুধু কয়েকটি পাথর খন্ড রাখা হয়েছিলো।
ইট, চুন, সুড়কি, পাথর ও পোড়ামাটির ফলক দিয়ে নির্মিত হয়েছে প্রাচীন এই মসজিদটি। সামনের অংশের ইটগুলোতে খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফুল ও লতা-পাতার নকশা। যা দেখলে যে কারোরই ভালো লাগবে।
একই সাথে মিনার, গম্বুজ ও ইটের বৈচিত্র্যময় গাঁথুনি মিলে পুরো স্থাপনাটি বেশ নান্দনিক আকাড় ধারণ করেছে। তবে আষাঢ়ের বৃষ্টিতে স্থাপনাটি নিজের সৌন্দর্য্য যেন আরো উজার করে দিচ্ছিলো।
আমি যখন পৌঁছালাম তখন আষাঢ়ের কালো মেঘ কেটে পশ্চিম আকাশে সূর্য হেলে পড়েছে। এমন সময় আমি মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলাম।
এর ভেতরে তিনটি কাতারে প্রায় ১০০ জন নামাজ পড়া যায়। মসজিদের ভেতরে দাঁড়িয়ে ওপরে তাকালে চোখে পড়বে গম্বুজের ভেতরের অংশের ইটের তৈরি বাহারি কারুকাজ। এখানে আছে ইমাম দাড়ানোর জায়গা এবং কয়েকটি বই রাখার তাক। শুধু তাই নয়, ভেতরের দিকটা নানা নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মসজিদের সৌন্দর্য্য।
তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির উত্তর-দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে দরজা রয়েছে। আর পূর্ব দিকে আছে তিনটি দরজা। মাঝের দরজাটি আকারে বেশ বড়। এই দরজার দুই পাশের দেয়ালে দুটি করে শিলালিপি বসানো আছে।
চারকোণে চারটি অষ্টভুজ মিনার রয়েছে। পশ্চিম দেয়ালের ভেতরে রয়েছে আয়তকার তিনটি মেহরাম। আকারের দিক দিয়ে মাঝেরটি তুলনামূলক বড় এবং বাকি দুটো একই সমান।
বন্ধুরা আপনাদের বলে রাখা ভালো যে, মসজিদটির ইতিহাস নিয়ে একটি বইও আছে। নাম ‘শেরপুরের ইতিহাস [অতীত ও বর্তমান]’। বইটি লিখেছেন অধ্যক্ষ মুহম্মদ রোস্তম আলী।
বইটিতে লেখা তথ্যমতে, তখন ১৬ শতকের শেষ দিক। সময়টা ছিল বারোভূঁইয়া ও মোগলবিরোধী বিপ্লবের সংকটকালীন মুহূর্ত। কাকশাল বিদ্রোহীদের শক্ত ঘাঁটি ছিল শেরপুর মোর্চা। বারোভূঁইয়া ছাড়াও আফগান বিদ্রোহীদের নেতা মাসুম খান কাবুলির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে কাকশাল বিদ্রোহীরা। সেই সময় এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়।
মসজিদের উত্তর-দক্ষিণের দৈর্ঘ্য ১৭ দশমিক ৩৪ মিটার। পূর্ব-পশ্চিমের প্রস্থ ৭ দশমিক ৫ মিটার। ভেতরের দৈর্ঘ্য ১৩ দশমিক ৭২ মিটার ও প্রস্থ ৩ দশমিক ৮ মিটার।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মসজিদের ছাদের নিচে উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ দেয়ালে পায়রাদের বসবাসের জন্য পৃথক কিছু জায়গা নির্মাণ করা হয়েছিল। যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা জাতের পাখি বসবাস করে আসছে। শুধু তাই নয় বিকেল গরিয়ে সন্ধ্যা নামতেই পাখিগুলোর কিচিরমিচিরে পরিবেশে ভিন্ন একটা মাত্রা যোগ করে।
এদিকে মসজিদের একটি শিলালিপির ভেতরে ছিল স্বর্ণখণ্ড, যা পরবর্তী সময়ে চুরি হয়ে যায়। এই মসজিদের একটি শিলালিপি বর্তমানে পাকিস্তানের করাচি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে বলে জানা যায়।

খেরুয়া মসজিদের পুরো চত্বর যেন কার্পেটের মতো। সবুজ ঘাসে বিছানো। মসজিদের চারপাশে তাল, নারকেল, আম ও কদমগাছের সারি রয়েছে। আর সীমানা প্রাচীরের ওপর লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। যার মাধ্যমে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরী করা হয়েছে।
মসজিদটির মোট জায়গার পরিমাণ ৫৯ শতাংশ। এটা নাকি সম্রাট আকবরের আমলে তৈরি। এতে ১২ কোনা ও আট কোনা কলাম ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও এর নামকরণের ইতিহাস কেউই বলতে পারেননি।
যেভাবে যাবে খেরুয়া মসজিদে
প্রথমে বগুড়া শহরের সাতমাথা থেকে শেরপুরের ধুনট মোড়ে যেতে হবে। সেখানে জনপ্রতি খরচ হবে ৪০ টাকা। এরপর অটোরিকাশায় চেপে ধুনট মোড় থেকে শাহবন্দেগী ইউনিয়নের খন্দকার টোলা গ্রামে নামলেই চোখে পড়বে খেরুয়া মসজিদ।
