বগুড়া ১৩ এপ্রিল ২০২২ঃ বগুড়ার শিবগঞ্জে নীরব হাসান (১৬) নামে এক স্কুলছাত্র আত্মহত্যা করেছে। দুপুরে নিজ ঘরে ফ্যানের সাথে ওড়না পেচিয়ে গলায় ফাঁস দেয় সে। নীরব শিবগঞ্জের পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। ঘটনাটি ৯ এপ্রিলের।
গত মাসের ২২ মার্চ শিবগঞ্জের মাজিহট্টা ইউনিয়নের দুই গ্রাম থেকে দুটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন, কৃষিশ্রমিক মোহাম্মাদ সবুজ (২১) ও কলেজছাত্রী মার্জিয়া জান্নাত (১৮) । পুলিশের দাবি, তাদের দু’জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে সবুজ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে বিষপান করে আত্মহত্যা করেন মার্জিয়াও।
দুপচাঁচিয়ায় পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়ায় সুমাইয়া আক্তারকে (১৫) বকাঝকা করেন তার মা। এতে অভিমান করে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে দশম শ্রেণীর ছাত্রী। ৭ ফেব্রুয়ারির ঘটনা এটি।
নীরব হাসান, মোহাম্মাদ সবুজ, মার্জিয়া জান্নাত ও সুমাইয়া আক্তার নয়, গত তিন মাসে বগুড়ায় আত্মহত্যা করেছে প্রায় ২৫ জনেরও বেশি। সম্পর্কের অবনতি, শিক্ষা জীবন নিয়ে হতাশা, পারিবারিক জটিলতা ও আর্থিক সংকট, মাদকাসক্তি আত্মহত্যার মূল কারণ বলছে একাধিক গবেষণা সংস্থাগুলো।
বগুড়ায় জেলা পুলিশের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলায় আত্মহত্যা করেছে ২০৫ জন। সে হিসেবে প্রতিমাসে গড়ে অন্তত ১৭ জন এই আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন।
চমকে উঠার মতো তথ্য এই যে, বগুড়া জেলায় গেল একযুগে আত্মহত্যা করেছেন ২ হাজার ৬৬০ জন। এরমধ্যে ২০১০ সালে ১৭৪ জন, ২০১১ সালে ১৭৭ জন, ২০১২ সালে ২০৬ জন, ২০১৩ সালে ২৩০ জন, ২০১৪ সালে ২৫৩ জন, ২০১৫ সালে ২৫০ জন, ২০১৬ সালে ১৯৮ জন, ২০১৭ সালে ২২১ জন, ২০১৮ সালে ২৩০জন, ২০১৯ সালে ২৭৭ জন, ২০২০ সালে ২৩২ জন আত্মহত্যা করেন।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি
বগুড়ায় গেল কয়েকমাসে ১০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। এর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বগুড়া আযিযুল হক কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. শরীফ রায়হান বলেন, “পড়ালেখা নিয়ে সমাজে একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। ফলে একজন শিক্ষার্থীর উপর নানা প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে করে তার উপর কি প্রভাব পড়ছে সেদিকে কিন্তু আমরা কেউ লক্ষ্য করছি না। যখন বিষয়টি একেবারে শেষ হয়ে যায়, তখন আমরা নিজেদের ভুলটা বুঝতে পারি।”
সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন এক প্রতিবেদনে জানায়, গতবছর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। সব থেকে বেশি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। মূলত ক্যারিয়ার নিয়ে উদ্বিগ্নতায় তাদের আত্মহননের পথে নিয়ে যাচ্ছে। আর সব থেকে বেশি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন সম্পর্কগত কারণে ২৪.৭৫ শতাংশ।
আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার কারণ
বৈশ্বিক মহামারী করোনার আঘাতে বিপর্যস্ত মানুষ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারে নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা আর্থিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। শিক্ষা, চাকরি ও আর্থিকসহ সব ক্ষেত্রেই বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একজন মানুষ যখন অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন তখন অতি তুচ্ছ কারণেও আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
সরকারি আজিজুল হক কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. মোঃ শরীফ রায়হান বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে যারা আত্মহত্যা করেছেন তাদের অধিকাংশই মধ্যবয়সী। মূলত উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে থাকে। এসময় তারা নিজেদের চিন্তাভাবনাটা বড় করে দেখে। তাদের মতের সাথে অমিল দেখা দিলেই বিপত্তি ঘটতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন কারণেই মানুষ আত্মহত্যা করতে পারেন। এরমধ্যে শারীরিক, দৈহিক, মানসিক, আর্থিক ও সামাজিক বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে মাদকাসক্তিও এর পেছনে দায়ী। তবে আত্মহত্যা কোনো সমাধান হতে পারে না।’
আত্মহত্যা প্রতিরোধের উপায়
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের (শজিমেক) মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহরিয়ার ফারুক বলেন, “যারা আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন, তাঁদের বেশির ভাগই আগে থেকে বেশ কিছু ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন তাদের কথা কিংবা কাজের মাধ্যমে। তাদের জীবনযাত্রা এবং কর্মকান্ড সম্পর্কেও খেয়াল রাখতে হবে। কাছের মানুষেরা এই ইঙ্গিতগুলো খেয়াল করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে অনেক আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) আত্মহত্যা প্রতিরোধে একটি প্রচারণা চালায়। তাদের মতে, সমবেদনা ও ভালোবাসা দিয়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা যায়। আত্মহত্যা প্রতিরোধের ৪টি প্রমাণিত ও কার্যকর হস্তক্ষেপের সুপারিশ আছে সংস্থাটির। এগুলো হলো-
আত্মহত্যার সরঞ্জাম হাতের কাছে সহজলভ্য না রাখা (যেমন: কীটনাশক, আগ্নেয়াস্ত্র, নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ ইত্যাদি) ।
আত্মহত্যা নিয়ে দায়িত্বশীল প্রতিবেদন প্রচারে গণমাধ্যমকে যুক্ত করে প্রশিক্ষণ প্রদান। কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক ও আবেগীয় জীবন দক্ষতায় পারদর্শী করা। আত্মঘাতী আচরণ দ্রুত শনাক্ত করা, যাচাই করা, ব্যবস্থা নেওয়া এবং ফলোআপ করা।
এনসিএন/এআইএ
