আড়াই হাজার বছরের পুরোনো শহর ‘পুণ্ড্রনগর’ মহাস্থানগড়। এই স্থানটি বাংলাদেশের প্রাচীন পুরাকীর্তিরগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রসিদ্ধ নগরীটি ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামেও বেশ পরিচিত। এক সময় মহাস্থানগড় বাংলার রাজধানী ছিল। যিশু খ্রিষ্টের জন্মেরও আগে অর্থাৎ প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে এখানে সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল। যার সুক্ষ্ম প্রমাণও মিলেছে প্রত্নতাত্ত্বিক ভাবেই। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কি.মি. উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে প্রাচীন এই শহরের ধ্বংসাবশেষ অবস্থিত।
মহাস্থানগড়ের ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিত ও উদঘাটন করার ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তির অবদান রয়েছে। ১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটন প্রথম মহাস্থানগড়ের অবস্থান চিহ্নিত করেন। পরবর্তীতে ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেক্সান্ডার কানিংহাম প্রথম এই প্রাচীন ঐতিহাসিক নগরীকে পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানীরূপে চিহ্নিত করেন। আর ২০১৬ সালে এটিকে সার্ক এর রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পুন্ড্রনগরের ইতিহাস সংরক্ষণে এখানে একটি জাদুঘর তৈরি করা হয়েছে।
মহাস্থানগড় খননের ফলে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন ও অন্যান্য রাজবংশের হাজার বছরের পুরানো অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন সেখানে সংরক্ষিত আছে। যেটি পর্যবেক্ষণের জন্য বিশ্বের নানান প্রান্তর থেকে দেশি-বিদেশি পর্যটক ও শিক্ষার্থীরা ছুটে আসেন। এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক গড় ও জাদুঘর ছাড়াও শাহ সুলতান বলখী মাহীসাওয়ারের মাজার শরীফ প্রাঙ্গনেও বেশ ভিড় লক্ষ্য করা যায়। কেননা শাহ সুলতান নামক আলোচিত ব্যক্তিটি ইসলাম ধর্মের প্রযোজক ছিলেন। উপমহাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে তিনি মাছের পিঠে করে পুন্ড্রনগরীতে এসে ঠাঁই নেন। তৎকালীন রাজা পরশুরামের নির্দেশে একটি জায়নামাজ বিছানোর মতো জায়গা পান শাহ সুলতান। পরবর্তী সময়ে তিনি ধর্মের ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এমন খবর রাজা পরশুরামের কানে পৌঁছালে তিনি বেশ রাগান্বিত হন এবং শাহ সুলতানকে রাজ্য ছেড়ে অন্যত্রে চলে যেতে বলেন। যে হুকুম মানতে নারাজ হন ইসলাম ধর্মের প্রযোজক শাহ সুলতান। এরপরই একটি যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে রাজা পরশুরামের অধ্যায়ের অবসান ঘটে। ইসলাম বিজয়ের পতাকা উড়িয়ে উল্লাস করেন শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ার ও তার অনুসারীরা। মহাস্থানে জিয়ত কুন্ডলী নামের একটি গভীর কূপ রয়েছে। যা দেখতে অনেক পর্যটকরা উন্মুখ হয়ে থাকেন৷ লোকমুখে শোনা যায়, রাজা পরশুরামের সৈনিকরা যুদ্ধে আহত কিংবা নিহত হলে তাদের জিয়ত কুন্ডলীতে নিক্ষেপ করলে সৈনিকরা পুনরায় জীবন ফিরে পেত।

ইসলাম ধর্মের প্রযোজক মাহী সাওয়ার বলখীর সাথে যুদ্ধচলাকালীন সময়ে সেই একই কাজ করেন পরশুরাম। যার ফলে পরশুরামের সৈনিকের সংখ্যা অপরিবর্তিত রয়ে যায়। কিন্তু একসময় কাকের মুখ থেকে গরুর গোশতের টুকরো পরার কারনে অলৌকিক বিষয়টি বন্ধ হয়ে যায়। জিয়ত কুন্ডলী নিয়ে আরো নানান কথায় শোনা যায় লোকমুখে তবে এ বর্ণনাটি অনেকেই বিশ্বাস করে থাকেন। মহাস্থানগড়ের নানান ঐতিহাসিক স্থানের মধ্যে আরো রয়েছে খোদা পাথর ভিটা, গোবিন্দ ভিটা, শীলা দেবীর ঘাট ও বেহুলার বাসরঘর। এই স্থানগুলো পর্যটকদের মুগ্ধ ও আকর্ষিত করে থাকে। গোকুল মেধ কিংবা বেহুলা লক্ষীনদারের বাসর ঘরটি বেশ পরিচিত ও অনেক পুরোনো অলৌকিক এক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গোকুল মেধের ধ্বংসাবশেষ দেখতে সেখানে প্রতিনিয়ত হাজারো দর্শক-পর্যটক ভিড় জমান। বর্তমান সময়ে পর্যটকদের দৃষ্টি আর্কষনে নানা উন্নয়ন মূলক পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে। গড়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থান গুলো চিহ্নিত করে চলছে গবেষণার কাজ। ফলে প্রতিনিয়ত খুঁজে পাচ্ছেন ততকালীন শাসকদের ব্যবহার্য তৈজসপত্র ও পুরোনো নানান নিদর্শন।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় টুরিস্ট পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দিনের বেলায় মহাস্থান গড়ের পুরো এলাকা জুড়েই হাজারো পর্যটকদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বছরের নানান সময়ে শিক্ষা সফরে এখানে বেড়াতে আসেন।
মহাস্থানগড়ের লাল কটকটি বেশ প্রসিদ্ধ। এখানে যেসব পর্যটক ঘুরতে আসেন তাদের অনেকেই এই খাবারটি সংগ্রহ করে থাকেন। এছাড়াও দুই থেকে তিন ধরনের কটকটি পাওয়া যায়। প্রতি কেজির মূল্য ৯০-১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়ে থাকে।

মহাস্থানগড়ের পুরাকীর্তি নিয়ে এখনো মানুষের মনে নানান কৌতুহল লক্ষ্য করা যায়। আড়াই হাজার বছরের পুরোনো এই নগরীতে একসময় রাজা, রাজপ্রাসাদ, সৈনিক ও অশ্বরোহী ঘোড়া সব ছিলো। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন সবকিছুই যেন কল্পকাহিনির মতো। পুণ্ড্রনগরীতে নানান সময়ে বিভিন্ন রাজা শাসন করার ফলে স্থানটি ইতিহাসের পাতায় অনবদ্য হয়ে আছে।
যেভাবে যাবেনঃ
বগুড়া শহরের প্রানকেন্দ্র সাতমাথা থেকে ১৫টাকা রিক্সা ভাড়ায় দত্তবাড়ি সিএনজি স্ট্যান্ড এ যেতে হবে। পরে সেখান থেকে ৩৫ টাকা ভাড়ায় মহাস্থানগামী সিএনজি করে মহাস্থানের মূল ফটকে গিয়ে নামতে হবে। আর যদি গোকুল মেধ কিংবা বেহুলার লক্ষিনদারের বাসর ঘর দেখতে হয় তাহলে সিএনজি চালককে বললেই বাঘোপাড়ায় অবস্থিত ঐতিহাসিক বেহুলার বাসর ঘরে যাওয়া যাবে।
