ডিসেম্বর ১, ২০২৫ ৪:০৭ পূর্বাহ্ণ

বগুড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত দিন দিন বাড়ছে

কিশোরগ্যাং। প্রতীকি ছবি।
কিশোরগ্যাং। প্রতীকি ছবি।

সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাং এর উৎপাত বেড়েছে। কিশোর অপরাধীরা ‘গ্যাং’ বা গ্রুপ সৃষ্টি করে বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রম চালাচ্ছে। জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে।

এই কিশোররা সমাজের মধ্যে নিজেদের মতো করে নতুন এক সমাজ গড়ে তুলছে। সেই সমাজের সংস্কৃতি, ভাষা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আচার-আচরণ সবকিছু আলাদা। বিভিন্ন নামকরণ দিয়ে গড়ে তুলছে অদ্ভুত এবং মারাত্মক ‘কিশোর গ্যাং’। যার ফলে সংঘটিত হচ্ছে নানাবিধ অপরাধ।

আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই, চুরি, পাড়া বা মহল্লার রাস্তায় মোটরসাইকেলের ভয়ংকর মহড়া, মাদক এবং ইয়াবা সেবন ও বিক্রি, চাঁদাবাজি, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা এমনকি হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে ভবিষ্যৎ সমাজের অপার সম্ভাবনাময়ী এসব গ্যাং-এর তরুণ এবং কিশোর সদস্যরা। প্রশাসন এ অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার পরও কিশোর গ্যাং এর অপরাধীদের কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। প্রকাশ্য দিবালোকে বা রাত আঁধারে অস্ত্র উঁচিয়ে ছিনতাইসহ হত্যার উৎসবে মেতে উঠছে কিশোর অপরাধীরা। ক্ষেত্রবিশেষে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় অপরাধীরা। ধরা পড়লেও শাস্তি কতটুকু হবে তা নিয়ে শংকিত ভুক্তভোগী মানুষ ও তাদের পরিবার। নানা ধরনের অপরাধ করার কৌশল রপ্ত করছে এইসব কিশোর অপরাধীরা।

আমাদের অনুসন্ধান বলছে, কিশোর অপরাধীরা বিভিন্ন গ্যাং এর মাধ্যমে তথাকথিত ‘বড় ভাইদের’ বা দলীয় নেতাদের আস্কারা পেয়ে অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষের অসহায় এ অবস্থা থেকে মুক্তি না মিললে সমাজে বাস করাও দ্বায় হবে।

বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, স্কুলের মেধাবি শিক্ষার্থীরাও এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়েছে। স্কুল ফাঁকি দিয়ে গ্রুপের আস্তানায় যোগ দেয়। আবার সন্ধ্যা থেকে রাত অবদি ঠাড্ডায় মেতে উঠে শহরের বিভিন্ন মাঠ, স্কুল মাঠ ও অলি-গলিতে। সেখানে তথাকথিত বড় ভাইরা তাদের নানা অপরাধের অপকৌশল শিখিয়ে দেয় বলে বিভিন্ন তথ্যে উঠে এসেছে। এসব তথ্য অপরাধের সঙ্গে স্কুল ছাত্রদের জড়িত থাকার তথ্যে চমকে উঠেন অনেকেই। এ নিয়ে মা-বাবা, অভিভাবক, আত্মীয়-স্বজন চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। মাদকের ছড়াছড়ি আর সন্ত্রাসের উপাদানগুলো হাতের কাছে পাওয়ায় কিশোর অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ‘বড় ভাইদের’ ও নেতাদের সহযোগিতা পেয়ে তারা দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। কে কোন সময় খুন, গুম, ছিনতাই কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হবে তা বলার কোন উপায় নেই।

অনলাইনে নানা পর্নো সাইট, অনলাইন গেম ও অশ্লীলতায়ও আসক্ত হচ্ছে কিশোররা। দিনরাত সোস্যাল মিডিয়ায় অবাধ বিচরণের মধ্য দিয়ে সময় ব্যয় করার কারণে পড়াশুনাতেও ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। করোনায় স্কুল বন্ধের সুযোগে যা একেবারে তলানিতে পৌঁছায়!

এসব বিষয়ে অভিভাবককে খোঁজখবর রাখতে হবে, বিপথে পা বাড়ানো আঁচ করতে পারলেই শুরুতে যেভাবেই হোক তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে।

এবিষয়ে বগুড়া জেলা পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শারাফত ইসলাম বলেন, “আমাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হয় তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবারের ইতিবাচক ভূমিকা। মা-বাবা, অভিভাবকদের নিজেদের সন্তানদের ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখতে হবে। কার সঙ্গে সে বন্ধুত্ব করছে, কোথায় কখন কী করছে, কোথায় যাচ্ছে ইত্যাদির ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তাদের চেষ্টার কমতি থাকা যাবে না। ছোটবেলা থেকে শিশুদের সুশিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দিতে হবে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা। যেসব কারণে কিশোররা অপরাধে জড়াচ্ছে তার মূলে পৌঁছাতে হবে। আমাদের পাঠ্যপুস্তকগুলোতেও শিক্ষামূলক, নৈতিক বিষয়বস্তু সংযোজন করতে হবে। নীতিহীন শিক্ষা থেকে শিশু-কিশোরদের বাঁচাতে এর কোনো বিকল্প নেই।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বগুড়া জেলা কমিটির সাধারন সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম তুহিন বলেন, “এমন অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টদের মানসিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য কাউন্সিলিং করা যেতে পারে। তবে প্রথমত পরিবারকে সচেতন হতে হবে। আপনার সন্তান কাদের সাথে চলাফেরা করে, তারা কোথায় যাচ্ছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বাসায় থাকার পর বাড়তি সময় কোথায় ব্যয় করছে এ ব্যাপারগুলোতে সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে। এছাড়া পরিবার এবং প্রসাশনের পাশাপাশি সমাজকেও এ ব্যাপারে সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে। এলাকা মহল্লা ভিত্তিক জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসতে হবে এসকল কিশোর গ্যাং যেন না তৈরি হয় সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।”

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Email
Print