নওগাঁর আত্রাই উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সংলগ্ন খোলাপাড়া এলাকায় অবস্থিত বানজু মেডিক্যাল স্টোর। সেখানে ঢুকতেই চোখে পড়বে ইসিজির রুম, এরপর রোগীদের বসার রুম। তারপরের রুমেই চিকিৎসক হিসেবে চেম্বারে বসে আছেন হামিদুল ইসলাম। পেছনে সাজানো আছে বিভিন্ন রকম ওষুধ।
বিনা ফিসের অজুহাতে রোগীদের শরীরে পুশ করছেন ইনজেকশন। বিক্রি করছেন চাহিদা মতো মূল্যে ওষুধ। তবে তিনি কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন না।
এভাবেই চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন হামিদুল ইসলাম নামের ওই ব্যক্তি। যিনি ছিলেন একসময় এমবিবিএস নামধারী ডাক্তার। দিতেন ব্যবস্থাপত্রসহ চিকিৎসা সেবাও। কিন্তু ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় এখন হয়েছেন ওষুধ বিক্রেতা।
অবশ্য সম্প্রতি অভিযোগ ওঠার পর তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে তদন্ত করেছেন দুই সদস্য বিশিষ্ট কমিটি। পেয়েছেন সত্যতা। বিষয়টি মুঠোফোনে নিশ্চিত করেছেন আত্রাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার খাইরুল আলম।
এদিকে নয়ন নামের এক চিকিৎসা সেবাগ্রহীতার করেছিলেন ইসিজি। চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে কিছু ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন হামিদুল ইসলাম। তবে সেখানে তার নেই কোনো পরিচয়।
অপরদিকে লেখাটি তার হলেও হামিদুল ইসলাম ইসিজি করেন না বলে জানালে। কিন্তু বের হয়ে আসার সময়ই নজরে পড়ে ইসিজি করার প্রস্তুতি। জিজ্ঞেস করতেই ইসিজি মেশিনটি ঢেকে ফেললেন সেখানে দায়িত্বরত এক নারী।
চিকিৎসা সেবা নিয়ে ফিরোজ নামের এক ভ্যানচালক সেবা গ্রহীতা তার প্রশংসা করে জানালেন, আমার পায়ের আঙুলে কানচ মাছের কাটা ফুটে সমস্যা শুরু হয়েছিল। কোথাও সমাধান না পেয়ে এখানে আসি। প্রথমে ১হাজার ৫ শত টাকার ওষুধ কিনে ভালো ছিলাম। শুক্রবার আবার এসে ৫ শত টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে। তবে তার আগে দুই হাতে দুটো ইনজেকশন করে দিয়েছে ডাক্তার। তাঁর কাছে এসে আমার সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে।
একইভাবে ইনজেকশন দিতে হয়েছে প্রায় ৬৫ বছরের জানবক্স নামে এক সেবাগ্রহীতাকে। তিনি বলেন, আমার গায়ে জ্বর ও ঠান্ডা লেগেছে। তাই ইনজেকশন করে দিল। ফ্রি হলেও ওষুধের দাম নিয়েছে। আমি বুড়া ও গরীব মানুষ তাই ১০০ টাকা নিয়েছে। তার সাথে আরও একজন ছিলেন, তিনিও জানালেন তাকেও ইনজেকশন দিতে হয়েছে। এভাবে সেখানে উপস্থিত প্রয়া ৫-৭ জন নারী পুরুষ জানালেন, এই ডাক্তার ফিস নেয় না। শুক্রবার ও শনিবার ফ্রি চিকিৎসা দেন। তবে তার কাছ থেকে ওষুধ কিনতে হয়। আর যেগুলো পাওয়া যায় না। সেই ওষুধ একটা কাগজে লিখে দেয় এবং বাহির থেকে কিনতে হয়।
সরেজমিনে গিয়ে জানতে চাইলে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হামিদুল ইসলাম বলেন, আমি এমবিবিএস ডাক্তার ছিলাম না। তবে পল্লী চিকিৎসকের ট্রেনিং নেওয়া আছে। আর আমার মতো অনেকে আছেন যারা অনায়াসে চিকিৎসা দিচ্ছেন। এমনকি প্রেসক্রিপশনে হাই এন্টিবায়োটিক পর্যন্ত লিখে দিচ্ছে। আমি শুধু ওষুধ বিক্রি করছি। তারপরও আমার পিছনে লাগছে। আমি কোনো ইসিজি করিনা। তবে কেউ বাহির থেকে ইনজেকশন কিনে নিয়ে আসলে আমি পুশ করে দিচ্ছি। এছাড়া আমি ওষুধ বিক্রি করছি। এখানে আগে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিয়ে এসে বিভিন্ন পরীক্ষাসহ চিকিৎসা সেবা দেওয়া হতো। এখন এগুলো বন্ধ আছে।
জানতে চাইলে আত্রাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার খাইরুল আলম মুঠোফোনে বলেন, সরেজমিনে গিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করার কথা ছিল। কিন্তু সে ভুল স্বীকার করায় গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে আমরা দুই জন মিলে তদন্ত করেছি। এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এখন উনাদের সিদ্ধান্তক্রমে হামিদুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শনিবার সন্ধ্যার দিকে জানতে চাইলে নওগাঁ সিভিল সার্জন ডাক্তার আমিনুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, হামিদুলের বিরুদ্ধে করা তদন্ত রিপোর্ট আমার কাছে এসেছে। তদন্ত রিপোর্ট দেখে প্রয়োজনীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনকে জানানো হবে।
