সপ্তাহের ছুটির দিনে আমরা দুজন সকালেই বেরিয়ে পড়ি। হালকা উত্তপ্ত সূর্যটি যখন আমাদের মাথার উপরে তখন পৌঁছালাম কাহালু স্টেশনে। এরপর আমরা যেখানে যাব সেই গন্তব্যের উদ্দ্যেশ্যে একটি নসিমনে করে সামনের দিকে এগোতে থাকলাম। মিনিট দশেক গ্রামের মেঠোপথ দেখতে দেখতেই আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে। এবার সেই নিদর্শনটি দেখতে যাবার পালা।
দূর থেকে অবশ্য বোঝার উপায় নেই এখানে কোনো নিদর্শন লুকায়িত রয়েছে। তবে বট গাছটির যতই কাছে যেতে থাকলাম ততই দৃশ্যমান হতে থাকলো তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি।
কয়েক দশক আগেও যেখানে ঝোপঝাড় ছিল। সেখানে এখন দৃশ্যমান বটগাছ ঘেরা প্রাচীন এই মসজিদটি! যেটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন অনেকেই।
মসজিদের পূর্ব পাশে একই ধরনের তিনটি গেট রয়েছে। যার উত্তর ও দক্ষিণ পাশে দুটো জানালা রয়েছে। কিন্তু বট গাছের শেকরে উত্তর পাশের জানালাটি প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছে।
এই মসজিদটি কোন আমলে নির্িমিত হয়েছে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায় নি। তবে মসজিদের কারুকার্য ও সুনিপুণ নকশা দেখে বোঝায় যায় এটা শত শত বছর আগের কোনো স্থাপত্য শিল্প।
দশকের পর দশক ধরে মানব সভ্যতার আড়ালে মসজিদটি আজ রূপান্তরিত হয়েছে বটগাছে। মিম্বার অর্থাৎ ইমাম দাঁড়ানোর জায়গাটি প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এখন নামাজ পড়ার কোনো অবস্থা নেই।
এই মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫ ফুট এবং প্রস্থ ১৩ ফুটের মতো। এই মসজিদের তিনটি গ্মবুজ রয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ পাশের একটি গম্বুজ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বাকি দুটো গম্বুজ এখনো দৃশ্যমান রয়েছে। তবে শ্যাওলা পড়ে যাওয়ায় গম্বুজগুলো সবুজ আকার ধারণে করেছে।
মসজিদটির দেয়ালে চুন-সুড়কি দিয়ে ছোট ছোট ইট গাঁথা আছে। বটগাছটির শেকড়ে ছেয়ে গেছে পুরো মসজিদ। কিন্তু বটের ছায়া ক্লান্ত পথিকের শরীর জুড়িয়ে দিবে।
মসজিদের ভেতরের অংশে মনোমুগ্ধকর রঙিন আলপনা রয়েছে। কিন্তু অবহেলায় সেসব আল্পনা তাদের সৌন্দর্য্য হারাচ্ছে।
পাশাপাশি আস্তরন কেটে কেটে মসজিদের সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়েছিলো। কিন্তু এখন ছাদের অংশটি হেলে পড়েছে, তাতে মাথা উচু করে ঠিকভাবে দাঁড়ানোও কষ্টকর।
এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিলো ৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ও ২ ইঞ্চি প্রস্থের পোরা মাটির ইট দিয়ে। তবে সংস্কারের অভাবে এসব ইটগুলো খসে পড়ছে। কোথাও কোথাও আবার গাছের শেকরে আবব্ধ হয়ে গিয়েছে ইটের আস্তরন।
স্থানীয়দের অনেকেরই ধারণা, এই স্থাপনাটি ৪৫০ বছর আগের, কেউবা বলছেন ১ হাজার বছর আগের, আবার অনেকেই বলছেন কত আগের হবে সে তথ্য দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এখনো মসজিদের পূর্ব ও উত্তর দিকের শতাধিক গজ পর্যন্ত যে কোনো স্থান খুঁড়লেই বেরিয়ে আসে পুরনো মাটির পাতিল, চুলা, কলস ও সে সময়কার পানি রাখার বড় পাত্রসহ নানা ধরনের প্রত্নসামগ্রী।
প্রাচীণ এই মসজিদকে কেন্দ্র করে এর সামনেই ২৩ শতক জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে ঈদগাহ মাঠ। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দুটি নামাজে দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিরা আসেন এখানে।
এদিকে মসজিদটির অদূরেই রয়েছে একটি কবর। সেটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ থেকে ১৪ ফুট।
স্থানীয়দের দাবি, ঐতিহাসিক প্রাচীন এই মসজিদের সংস্কার কাজ শুরু করা গেলে জায়গাটির গুরুত্ব বেড়ে যাবে। একাধিকবার উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করেও কোনো সুরাহা হয়নি এই স্থানটির বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।
তবে নিজেদের উদ্যোগে স্থানটি পরিষ্কার করে ২৩ শতকের উপরে একটি ঈদগাহ নির্মাণ করেছেন দুই গ্রামের মানুষেরা।
যেভাবে যাবেন এই মসজিদে
প্রথমে বগুড়া শহরের স্টেশন রোড থেকে ২০ টাকা খরচে সিএনজি যোগে কাহালু স্টেশন যেতে হবে। তারপর সেখান থেকে নসিমন কিংবা ভ্যান করে বোরতা গ্রামে গিয়ে নামতে হবে। এখানে খরচ হবে জনপ্রতি ১০ টাকা কতে। এরপর যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দিবে প্রাচীন এই মসজিদটি।
