জুন ২৩, ২০২৪ ৭:৩৭ পিএম

নষ্ট হচ্ছে যুব সমাজ; সম্ভাবনা আছে অপরাধমূলক কর্মকান্ডের

নওগাঁর রাণীনগরে বেড়েছে প্রকাশ্যে মাদক সেবন; চলে জুয়ার আড্ডা

নওগাঁর রাণীনগরে বৃদ্ধি পেয়েছে বিভিন্ন মাদক দ্রব্য সেবন ও বিক্রির প্রবণতা। এমন অভিযোগ জনপ্রতিনিধিসহ একাধিক স্থানীয়দের। উপজেলার প্রতিটি এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ার কারণে দ্রুতই মাদক কারবারীরা এক স্থান থেকে অন্যস্থানে মাদকদ্রব্য সরবরাহ করতে পারছে। পাশাপাশি জুয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। আর মাদক সহজে পাওয়ায় অনেকে কৌতুহলবশত না বুঝে মরণফাঁদ নামক মাদকের নীল ছোবলে যুক্ত হচ্ছে। ফলে যুব সমাজ নিয়ে চরম উদ্বিগ্নের মধ্যে রয়েছে অভিভাবকরা।

পুলিশ প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে আবার কাউকে ম্যানেজ করে দলীয় ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তিরা পুরো উপজেলাকে ঠেলে দিচ্ছে মাদকের অন্ধকার জগতে। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গাঁজা, ইয়াবা (বাবা), হেরোইন, চোলাই মদ, দেশি মদ, তাড়ি, বুপ্রেনরফিন, এ্যাম্পল পাওয়া যাচ্ছে। তবে গাঁজা ও ইয়াবার বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাঝে মধ্যে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন চিহ্নিত কিছু মাদক কারবারীদের আটক করে জেলে দিলেও আইনের ফাঁক দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে বেরিয়ে এসে আবার দেদারছে শুরু করে মাদকের কারবার। চিহ্নিত মাদক কারবারীদের ও মাদকের সম্রাটদের দীর্ঘ আইনের আওতায় এনে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী করেছেন উপজেলার সচেতনমহল।

আবার মাদকের সঙ্গে একাধিক রকমের জুয়াসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডও বেড়েছে বলে একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ। এলাকার স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থীসহ যুবসমাজ মাদকে আসক্ত হয়ে ও জুয়ায় টাকা হেরে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই মাদকের কারবার করে হঠাৎ করেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হওয়ার কারণে স্থানীয়রা তাদের ভয়ে কোনো প্রতিবাদও করতে পারে না।

জানা গেছে, রাণীনগর উপজেলার পূর্বদিকে বগুড়ার নন্দীগ্রাম ও উত্তর দিকে আদমদীঘি এবং সদর থানা। আবার দক্ষিণ দিকে নওগাঁর আত্রাই, নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার কালীগঞ্জ এলাকা ও পশ্চিম দিকে মান্দা উপজেলা। এমন সুযোগে উপজেলার পারইল ইউনিয়নের পারইল বাজার, বগারবাড়ি মোড়, ভান্ডারগ্রাম বাজার, বিলকৃষ্ণপুর বাজার, ডুবাগাড়ী বাজার, কালিগ্রাম ইউনিয়নের ভেটি এলাকা, আবাদুপুকুর বাজার, করজগ্রাম, রাতোয়াল বাজার, একডালা ইউনিয়নের অধিকাংশ জনগুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো, বড়গাছা ইউনিয়নের বড়গাছা বাজার, মালশন-গিরিগ্রাম বাজার, শলিয়া, ভাটকৈ বাজার, সদর উপজেলার লোহাচূড়া বাজার, সিম্বা বাজার এলাকা, রাণীনগর বাজার এলাকার সুইপার পট্টি (মেথর পট্টি), রেলস্টেশন ও রেলগেইট এলাকা, হাতিরপুল এলাকা, বটতলী মোড়, চোরপট্টীপাড়া, সদর ও আদমদীঘি উপজেলার সীমান্তবর্তি এলাকা চকউজির স্কুল এলাকা, উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ স্থানগুলো বাহাদুরপুর গ্রামের বাজার, হাসপাতাল মোড়, ত্রিমোহনী হাট, মন্ডলের ব্রীজ, কুবরাতলী মোড়, এনায়েতপুর মোড়, কুজাইল বাজার, গোনা ইউনিয়নের বেতগাড়ী বাজার, গোনা বাজার এলাকা, আত্রাই উপজেলার সীমান্তবর্তি এলাকা প্রেমতলী মোড়, পাগলীর মোড়, রেললাইন সংলগ্ন নওগাঁ-নাটোর আঞ্চলিক মহাসড়কের বিভিন্ন মোড়, মিরাট ইউনিয়নের মিরাট বাজার, আত্রাই ও মান্দা উপজেলার সীমান্তবর্তি এলাকা বান্দাইখাড়া এলাকাসহ উপজেলার প্রায় সকল ইউনিয়নেই নতুন করে জমে উঠেছে বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের বেচা-কেনা ও সেবন।

উপজেলার কাশিমপুরের আকাশ (ছদ্মনাম), কুজাইলের সম্রাট (ছদ্মনাম) আতাইকুলার জীবন (ছদ্মনাম) সকলেই জানান, হঠাৎ করে মাদকের বেচা-বিক্রি ও সেবন বৃদ্ধি পেয়েছে। কেউ কেউ কৌশল পাল্টিয়ে স্থান পরিবর্তন করে অনায়াসে মাদক বিক্রি করছে। আর একারণে বৃদ্ধি পেয়েছে মাদকসেবীর সংখ্যা। তবে জুয়া তেমন চলেনা জানিয়ে তারা জানান, মাঝে মাঝে কোনো গোপন জায়গায় খেলে। অথবা কারো বাড়িতে চলে জুয়া। আর লুডুর জুয়াতো এখন ওপেন সিক্রেট।

মিরাটের জামালগঞ্জ এলাকায় রাতের বেলায় চলতো লাখ লাখ টাকার জুয়া। তারা দুই নং স্লুইচ গেটসহ তিন জায়গায় লোক রেখে এই জুয়া চালাতো। ওই এলাকায় পুলিশ পৌঁছলে তারা একে অপরের মাধ্যমে খবর দিয়ে দেয়। তবে সেটা বন্ধ হলেও গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় মাঝে মাঝে চলে জুয়া খেলা। আর ধনপাড়া এবং হামিদপুর এলাকায় অনায়াসে চলছে বাংলা মদ বিক্রি। এমন অভিযোগ এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তির।

উপজেলার ভেটি গ্রামের কালাম সরদার (ছদ্মনাম) বলেন, বেশকিছুদিন যাবত ভেটি গ্রাম এলাকাটি অনেকটাই মাদকমুক্ত ছিলো। কিন্তু সম্প্রতি চিহ্নিত মাদক কারবারীরা পুনরায় মাদকের রমরমা ব্যবসা শুরু করেছে। কোনো কিছু বলতে গেলেই পুলিশের ভয় ও হয়রানী মূলক মামলার ভয় দেখায়। হাতের কাছে পাওয়ায় মাদকের নীল নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে তরুন ও যুব সমাজ। সন্তানেরা বড় হয়ে গেলে আর কত চোখে চোখে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে। অথচ পুলিশ বাহিনী ইচ্ছে করলেই নিমিষের মধ্যে এলাকা থেকে মাদকের দৌরাত্ম কমাতে পারে।

কুবরাতলী এলাকার এক মাদককারবারী মো. রইচ উদ্দিন (ছদ্মনাম) গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, মাদকদ্রব্যের চলাচলের পথ রোধ না করা পর্যন্ত মাদকের বিস্তার প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। যারা প্রভাবশালী এবং যারা থানা পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে আসছে তারা প্রকাশ্যে মাদকের রমরমা ব্যবসা করলেও পুলিশ তাদেরকে দেখতে পায় না। অথচ পুলিশ চাইলেই উপজেলাকে মাদক মুক্ত করতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।

পারইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহিদুর রহমান মুঠোফোনে বলেন, উপজেলার মধ্যে পারইল ইউনিয়ন মাদকের হটস্পটে পরিণত হয়েছে। ইদানিং এই ইউনিয়নের অধিকাংশ স্থানই মাদক বিস্তারের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রকাশ্যে বিভিন্ন এলাকায় মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়। বিশেষ করে বড়ি বেশি বিক্রি হয়। তিনি একটু ক্ষোভ নিয়েই বলেন, প্রতিটি উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা মিটিং-এ মাদক নিয়ে কথা বলেছি। কোনো লাভ হয় না। তাই মাদক নিয়ে আর কোনো কথা বলতে চাই না। কিন্তু যখন দেখি ইউনিয়নের তরুন-যুবকরা চোখের সামনে মাদকের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, তখন খুব কষ্ট হয়, খুব খারাপ লাগে। অনেকবার মাদকের বিস্তাররোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা বাস্তবায়ন করার মতো কোনো সহযোগিতা না পাওয়ার কারণে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছি।

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু ওবায়েদ মোবাইল ফোনে বলেন, জুয়া কোথায় হচ্ছে সেটা তিনি জানতে চান এই প্রতিবেদকের কাছে। তবে গ্রামের দু-এক জায়গায় বসে ম্যারেজ খেলতে পারে বলে স্বীকার করেন তিনি। আর মাদকের বৃদ্ধি পাওয়া বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই বিষয়টি দেখতেছি। থানা পুলিশ সব সময় মাদকের বিরুদ্ধে। আমরা প্রতিনিয়তই মাদকের বিস্তার রোধে জড়িতদের আটক করছি এবং আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করছি। এই উপজেলায় মাদকের বিস্তারকে জিরো টলারেন্সে আনতে আমরা পুলিশ বদ্ধ পরিকর। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে এবং চলবে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Email
Print